Vromon Blog

Tour Site

টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। এর অবস্থান সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলায়। টাঙ্গুয়ার হাওরের কারণে সুনামগঞ্জ কে বলা হয় হাওর কন্যা। জীববৈচিত্র সমৃদ্ধ এ হাওরকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয় ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি। চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর টাঙ্গুয়ার হাওর। টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্রুপ জলমহাল গুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে এর মোট জলমহাল সংখ্যা ৫১ টি এবং এর মোট আয়তন ৬৯১২.২০ একর। তবে নলখাগড়া বন, হিজল-করচ বনসহ বর্ষাকালে সমগ্র হাওরটির আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ২০,০০০ একর। ভরা বর্ষায় যেন মায়াবী রূপ ধরা দেয় এ হাওর। বিশাল এ জলাভূমিতে প্রকৃতি বেড়ে উঠেছে আপন খেয়ালে। নিজের চোখে এর সৌন্দর্য না দেখলে উপলব্ধি করা যাবেনা। হাওরের কোথাও চোখে পড়বে নানা রকমের শাপলা ফুলের মেলা, কখনো নানা গাছ গাছালির অপরূপ সাজ। আবার কখনো মিলবে টলটলে স্বচ্ছ পানির শান্ত হয়ে বয়ে চলা। ছবির মত দেখতে সুন্দর এ হাওর ভারতের মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থিত। মেঘালয় পর্বত থেকে প্রায় ৩৮ টি ঝর্ণা এসে সরাসরি মিশেছে হাওরের পানিতে। হাওড়া আগে ১২০ কান্দা (পাড়) বিশিষ্ট ১৮০ টি বিল ছিল। তাই স্থানীয়রা একে ছয় কুড়ি কান্দার নয় কুড়ি বিল বলে। বিলের পাড়ে সারি সারি হিজল, করচ আর নলখাগড়ার বন। মাছ, গাছ আর পাখি এই তিনের মিতালী টাঙ্গুয়ার হাওর। টাঙ্গুয়ার হাওর কে বলা হয় দেশি মাছের আধার। মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এখানে প্রায় ২০০ প্রজাতির গাছ গাছালি রয়েছে, পাশাপাশি ৪১ প্রজাতির মাছ, ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটি, ২১ প্রজাতির সাপ রয়েছে। শীত মৌসুমে ব্যাপক পরিমাণে অতিথি পাখির আগমন ঘটে। বিলুপ্তপ্রায় প্যালেসের ঈগল, বৃহৎ আকারে গ্রে-কিস্টক, শকুন, গাংচিল, বক, সারস প্রভৃতি পাখির বিচরনে পরিবেশ মুখরিত থাকে। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন।

কখন যাবেন:

বর্ষাকাল সবচেয়ে উত্তম সময়। কেননা বর্ষাকালে হাওর পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। তবে শীতকালে এর প্রকৃতি ভিন্ন থাকে। শীতকালে হাজার হাজার অতিথি পাখিদের বিচরণ দেখতে পারেন।

কিভাবে যাবেন:

টাঙ্গুয়ার হাওরে যেতে হলে প্রথমে আপনাকে যেতে হবে সুনামগঞ্জে। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ বাসে সরাসরি যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জের দূরত্ব ২৯৬ কিলোমিটার। ঢাকার সায়দাবাদ থেকে শ্যামলী, এনা, মামুন, নূর, একতা, সাউদিয়া, নিউলাইন, মিতালী প্রভৃতি পরিবহনের বাস সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এসি ও নন-এসি বাসের ভাড়া ৫৫০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত।

রেলপথের সরাসরি সুনামগঞ্জে যাওয়া যায় না। তাই ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনে করে সিলেটে যেতে হবে। অতঃপর  বাসে করে সুনামগঞ্জে আসতে হবে। উপবন, উদয়ন, পাহাড়িকা, জয়ন্তিকা প্রভৃতি ট্রেনে করে সিলেট যাওয়া যায়। ভাড়া শ্রেণীভেদে ৮০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। আবার আকাশ পথে ঢাকা থেকে সিলেট যেতে পারবেন। বাংলাদেশ বিমান, জেট এয়ার, নোভা এয়ার, রিজেন্ট এয়ার, ইউনাইটেড এয়ার সহ বিভিন্ন বিমান সংস্থার বিমান ঢাকা থেকে সিলেটে প্রতিনিয়ত চলাচল করে। ভাড়া ৩০০০ থেকে ৪০০০ টাকা। এরপর সিলেট থেকে বাসে করে সুনামগঞ্জে যেতে হবে। সুনামগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড হতে রিকশায় সাহেব বাজার ঘাট পর্যন্ত যাবেন। সাহেব বাজার ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত বোট অথবা স্পীড বোটে সরাসরি টাঙ্গুয়ার হাওরে যাওয়া যায়। ভাড়া ইঞ্জিনচালিত বোটে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা এবং সময় লাগে ৫ ঘন্টা। টাকা আবার স্পীডবোটে সময় লাগে দুই ঘন্টা ভাড়া ৭৫০০ টাকা থেকে ৮০০০ টাকা।

কিভাবে কম খরচে যাবেন:

ঢাকা থেকে নন-এসি বাসে সরাসরি সুনামগঞ্জে গেলে ভাড়া কম লাগে। এক্ষেত্রে ভাড়া ৫৫০ টাকা। সুনামগঞ্জের সাহেব বাজার ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত বোটে করে সরাসরি টাঙ্গুয়ার হাওরে যাবেন। একসাথে অনেকে গেলে ভাড়া কম লাগে। ভাড়া ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা।

কিভাবে বিলাসবহুল ভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে এসি বাসে করে সুনামগঞ্জে যেতে পারেন। ভাড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। যদি আকাশ পথে যেতে চান তাহলে ঢাকা থেকে সিলেটে যেতে হবে। সেখান থেকে বাসে অথবা প্রাইভেটকারে সুনামগঞ্জে যেতে হবে। সাহেব বাজার থেকে স্পিড বোটে করে টাঙ্গুয়ার হাওরে যেতে পারেন। স্পিড বোটে  সময় কম লাগে, ভাড়া ৭৫০০ থেকে ৮০০০ টাকা পর্যন্ত।

কোথায় থাকবেন:

রাতে হাওরে থাকতে চাইলে বোটে থাকতে পারেন। যাতায়াত ভাড়াসহ এসকল বোটের ভাড়া ৫০০০ টাকা। যেসকল ইঞ্জিনচালিত বোটে হাই কমোড সহ বাথরুম ও ছাদে তেরপাল আছে সেই সকল বোটের ভাড়া ৬০০০ থেকে ১০০০০ টাকা পর্যন্ত। ছুটির দিনগুলোতে ভাড়া বেশি হয়। আবার সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৩ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পের রেষ্ট হাউজে থাকার ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও সুনামগঞ্জে থাকার জন্য স্থানীয় পর্যায়ের ভিআইপি ও মোটামুটি মানের হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। সেখানে ৪০০ থেকে ২০০০ টাকায় বিভিন্ন মানের রুম পাওয়া যায়। এসব হোটেলের মধ্যে রয়েছে-

১। হোটেল নূরানী

ঠিকানা: পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, স্টেশন রোড, সুনামগঞ্জ।

ফোন: ০৮৭১৫৫৩৪৬, ০১৯১৬-১৪২৯৩৯

২। হোটেল নূর

ঠিকানা: পূর্ব বাজার, স্টেশন রোড, সুনামগঞ্জ।

ফোন: ০৮৭১৫৫২২৫, ০১৭১৮৬৩০৮৮৭

৩। হোটেল মিজান

ঠিকানা: পূর্ব বাজার, স্টেশন রোড, সুনামগঞ্জ ।

ফোন: ০৮৭১৫৫৬৪০

৪। হোটেল সারপিনিয়া

ঠিকানা: জগন্নাথ বাড়ি রোড, সুনামগঞ্জ

ফোন: ০৮৭১৫৫২৭৮

৫। সুরমা ভ্যালি আবাসিক রিসোর্ট

ঠিকানা: ১৪ তূসন, সুলোঘর, সুনামগঞ্জ।

ফোন: ০০৮৮২৮৯১৩৯৫৬, ০১৭১১-৪৩৮৮০৩

কিভাবে কম খরচে থাকবেন:

ছোটখাটো ট্যুর হলে রাতে হাওরে কম খরচে বোটে  থাকতে পারেন। সুনামগঞ্জ শহরের হোটেল গুলোতে কম খরচে থাকতে পারবেন। হোটেল নূর, হোটেল মিজান, হোটেল সারপিনিয়া, হোটেল নূরানী প্রভৃতি হোটেলগুলোতে কম খরচে থাকতে পারেন। ভাড়া ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা।

কিভাবে বিলাসবহুল ভাবে থাকবেন:

সুনামগঞ্জে উন্নত মানের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট আছে। সুরমা ভ্যালি আবাসিক রিসোর্ট এদের মধ্যে অন্যতম। এতে ভাড়া লাগে ১৫০০ টাকা।

কোথায় খাবেন:

রাতে থাকার জন্য নৌকা ভাড়া করলে প্রয়োজনীয় বাজার সদাই করে নিবেন, সে অনুযায়ী রান্না করে খেতে পারবেন। তাহিরপুরে তেমন ভাল খাবারের হোটেল পাবেন না। তবে কয়েকটি হোটেল মাঝারি মানের হোটেলে খাবার পেয়ে যাবেন। সুনামগঞ্জ শহরে ভালো মানের খাবার হোটেল আছে সেগুলো খেতে পারেন। এদের মধ্যে পাঁচ ভাই হোটেল, জনতা হোটেল, হোটেল রাজ উল্লেখযোগ্য।

কিভাবে কম খরচে খাবেন:

মাঝারি মানের খাবারের হোটেল গুলোর মধ্যে জনতা হোটেল, পাঁচ ভাই হোটেল জনপ্রিয়। এখানে অল্প দামে খাবার পাওয়া যায়।

কিভাবে বিলাসবহুল ভাবে খাবেন:

ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্ট, রূপসী বাংলা রেস্টুরেন্ট, রুবিতা সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্ট, সোনারগাঁ রেস্টুরেন্ট, নিউ গ্রামীন রেস্টুরেন্ট প্রভৃতি রেস্টুরেন্টগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করে। তাই এইসব হোটেলগুলোতে চাহিদামত খেতে পারেন।

পরামর্শ যে কাজ গুলো করবেন !

যানবাহন ও হোটেল ভাড়া করার সময় যাচাই-বাছাই করে নিবেন। সন্ধ্যায় হাওরের প্রকৃতি উপভোগ করতে পারেন। সাথে পাওয়ার ব্যাংক এক্সট্রা ব্যাটারি সাথে রাখবেন। খাবার স্যালাইন সহ প্রয়োজনীয় জিনিস সাথে রাখবেন। জরুরী প্রয়োজনে ৯৯ কল করবেন।

পরামর্শ যে কাজ গুলো করবেন না !

সাঁতার না জানলে গভীর পানিতে যাবেন না। অপরিচিত কারও দেওয়া জিনিস খাবেন না। হাওরের পানিতে ময়লা ফেলে পানি দূষিত করবেন না।

—- আপনার ভ্রমন হোক আনন্দময়। —-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *